গাজীপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক: মাঠজুড়ে রোদেলা দুপুরের প্রখর তেজ। গ্রামবাংলার চিরচেনা বৈশাখী খরতাপে যখন প্রকৃতি তপ্ত, তখন গাজীপুর সদর উপজেলার ভুরুলিয়া গ্রামের দিগন্তজোড়া সোনালি ধানক্ষেতে দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। কাস্তে হাতে ধানের গোছায় মগ্ন একদল মানুষ—যাদের পরনে নেই কৃষকের গতানুগতিক পোশাক, কিন্তু চোখে-মুখে রয়েছে মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গভীর তৃপ্তি।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) গাজীপুরের এই নিভৃত পল্লীতে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করলো রোটারি ক্লাব অব ভাওয়াল। শ্রমিক সংকট আর আকাশছোঁয়া মজুরির এই সময়ে যখন মাঠের পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন প্রান্তিক কৃষকেরা, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে মাঠে নামলেন এই সেবা সংগঠনের সদস্যরা।

কাস্তে হাতে সেবার ব্রত
অসচ্ছল কৃষকদের সহায়তা করার এই অনন্য উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন রোটারি ক্লাব অব ভাওয়ালের প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আমিরুল ইসলাম। মাঠের কাদামাটি আর ধানের শিষের ঘ্রাণ গায়ে মেখে তিনি বলেন, “রোটারি সবসময়ই মানুষের কল্যাণে কাজ করে। কৃষকেরা আমাদের অন্নদাতা; তাদের ঘামেই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আজ আমরা কেবল তাদের ধান কাটিনি, বরং তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি।”
কর্মসূচিতে আরও সংহতি প্রকাশ করেন রোটারি ক্লাব অব গাজীপুর সেন্ট্রালের প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গীর কবির, রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের প্রেসিডেন্ট বাবুল হোসেন এবং অ্যাসিস্টেন্ট কো-অর্ডিনেটর জাহাঙ্গীর আলম। রোটারি ক্লাব অব ভাওয়ালের চার্টার প্রেসিডেন্ট জনাব ইমতিয়াজ সাজুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সেক্রেটারি মাহমুদুর রহমান পলাশ।
এক পাতে খাবার: ভ্রাতৃত্বের জয়গান
ধান কাটার আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও এই আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি ছিল কৃষকদের সঙ্গে রোটারিয়ানদের দুপুরের আহার। গ্রামের বনভূমির ছায়ায় মাটির ওপর পাটি পেতে যখন রোটারি সদস্যরা আর কৃষকেরা এক সারিতে বসে খাবার খাচ্ছিলেন, তখন সামাজিক বিভাজনের দেওয়াল যেন মুহূর্তেই ধসে পড়ে। এটি ছিল নিছক কোনো সাহায্য নয়, বরং দুই শ্রেণির মানুষের হৃদয়ের বন্ধন তৈরির এক আবহমান চিত্র।
কৃষকের চোখে কৃতজ্ঞতার ঝিলিক
ভুরুলিয়া গ্রামের এক বয়স্ক কৃষক অভিভূত হয়ে বলেন, “শহরের বড় বড় মানুষেরা আমাদের রোদে পুড়ে কষ্ট করাটা বুঝছেন, এটাই আমাদের বড় পাওনা। শ্রমিকের অভাবে ধান কাটা নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম, তাদের এই সহযোগিতা আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।”

এক নতুন সামাজিক বার্তা
বর্তমানে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোটারি ক্লাব অব ভাওয়ালের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে যেকোনো সামাজিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব। শহুরে সমাজের সঙ্গে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার এই সেতুবন্ধন কেবল একটি ইভেন্ট নয়, বরং আমাদের জাতীয় মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
বৈশাখের এই নতুন ধানের উৎসবকে ঘিরে গাজীপুরের মাঠে মানবিকতার যে বীজ বপন করা হলো, তা অন্যান্য সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।