আন্তর্জাতিক ডেস্ক, লন্ডন : ভাই অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারের পর এক কঠিন সংকটের মুখে পড়েছেন ব্রিটেনের রাজা চার্লস তৃতীয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সিংহাসনে আরোহণের পর থেকেই একের পর এক পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে ৭৭ বছর বয়সী এই রাজাকে। রাজপরিবার বিশ্লেষকদের মতে, অ্যান্ড্রুর এই গ্রেপ্তার আধুনিক রাজকীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
রাজকীয় ভাষ্যকার এড ওয়েন্স এএফপি-কে বলেন, “সিংহাসনে বসার পর থেকেই চার্লস বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত—সেটি তার ছোট ছেলে হ্যারির সাথে তিক্ততা হোক, নিজের বা প্রিন্সেস অফ ওয়েলস ক্যাথরিনের ক্যানসার হোক কিংবা অ্যান্ড্রুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।”
সংকটের দীর্ঘ তালিকা
রানি এলিজাবেথের ৭০ বছরের শাসনের পর যখন চার্লস দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই অস্থিরতা শুরু হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রিন্স হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’ (Spare) প্রকাশিত হলে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ কলহ জনসমক্ষে চলে আসে। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজার ক্যানসার শনাক্ত হয় এবং এর কয়েক সপ্তাহ পরেই পুত্রবধূ ক্যাথরিনের ক্যানসারের খবর আসে। যদিও তারা বর্তমানে সুস্থতার পথে, কিন্তু অসুস্থতার এই ছায়া রাজপরিবারকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছিল।
অ্যান্ড্রু: এক ‘অবিস্ফোরিত বোমা’
তবে রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন রাজার ছোট ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর। মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রাজপরিবারকে বছরের পর বছর ধরে বিব্রত করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত অক্টোবরে চার্লস তার ভাইয়ের সমস্ত রাজকীয় উপাধি কেড়ে নিয়েছিলেন।
কিন্তু গত মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত নতুন নথি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) অ্যান্ড্রুকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের বাণিজ্য দূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এপস্টাইনকে অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।
রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু লোনি বলেন, এটি রাজতন্ত্রের জন্য একটি ‘সঙ্কটকাল’। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে রাজপরিবার অ্যান্ড্রুর অপরাধ আড়াল করতে তাকে সহায়তা করেছে, তবে রাজাকে সিংহাসন ছাড়ার চাপের মুখেও পড়তে হতে পারে।
রাজা চার্লস বৃহস্পতিবার এক বিরল ব্যক্তিগত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে” এবং এই ঘটনায় তিনি “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৩৬ সালে অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ এবং ১৯৯৭ সালে ডায়ানার মৃত্যুর পর এটিই রাজপরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এড ওয়েন্সের ভাষায়, “রানি এলিজাবেথ অ্যান্ড্রু নামক এক অবিস্ফোরিত বোমা চার্লসের হাতে দিয়ে গেছেন।”
এখন জনগনের আস্থা ও রাজতন্ত্রের ‘নৈতিক কর্তৃত্ব’ পুনরুদ্ধার করতে প্রিন্স উইলিয়াম ও রাজা চার্লসকে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।