নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স আয়ের ওপর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া নেমে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এই উত্তেজনা শ্রমবাজার, বিমান চলাচল এবং কর্মসংস্থানে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেখানে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর ওপর।
শ্রমবাজারে ট্র্যাজেডি ও ফ্লাইট বিপর্যয়
চলমান এই সংঘাত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য ট্র্যাজেডি বয়ে এনেছে। সংঘাতের কবলে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে অন্তত তিনজন বাংলাদেশি নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শ্রমিকদের যাতায়াত ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। বায়রা (BAIRA) এর সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং রিয়াজ ওভারসিজ-এর স্বত্বাধিকারী রিয়াজ-উল-ইসলাম বলেন, “সংঘাত শুরুর পর গত ৯ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে অন্তত ৩০০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রী, যাদের অধিকাংশই প্রবাসী শ্রমিক, আটকা পড়েছেন।”
তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে। ছুটিতে আসা কর্মীরা কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, অন্যদিকে হাজার হাজার নতুন কর্মী তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এতে তাদের অভিবাসনের পেছনে বিনিয়োগ করা সারাজীবনের সঞ্চয় হারানোর উপক্রম হয়েছে।
ঝুঁকির মুখে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার
মধ্যপ্রাচ্য হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল কেন্দ্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে জিসিসি (GCC) ভুক্ত দেশগুলো— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান থেকে।
- ২০২৫ সালের রেকর্ড: গত বছর বাংলাদেশ ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স অর্জন করেছে।
- আঞ্চলিক অবদান: এর মধ্যে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে কেবল মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যেখানে ৪৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে গত বছরের সেই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তুলনামূলক চিত্র: ২০২৫ বনাম সম্ভাব্য ২০২৬ (প্রক্ষেপণ)
| সূচক | অর্থবছর ২০২৪-২৫ (প্রকৃত) | অর্থবছর ২০২৫-২৬ (প্রক্ষেপণ/ঝুঁকি) |
| মোট বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স | ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার | ২৮.৫ – ৩০.০ বিলিয়ন ডলার (সম্ভাব্য) |
| মধ্যপ্রাচ্যের অংশ | ৪৫.৪০% | যুদ্ধ চললে ৪০%-এর নিচে নামার শঙ্কা |
| নতুন জনশক্তি রপ্তানি | ১১ লাখ শ্রমিক | ফ্লাইট সংকটে ৩০% হ্রাসের আশঙ্কা |
সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের কৌশলগত গুরুত্ব
বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের শীর্ষ দুই উৎস এখন সরাসরি হুমকির মুখে:
- সৌদি আরব: ২.৫ মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশির এই শ্রমবাজার থেকে গত অর্থবছর ৬.৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সৌদির “ভিশন ২০৩০” এর আওতায় নতুন জনশক্তি নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হতে পারে।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): গত অর্থবছর ৪.৮ বিলিয়ন ডলার পাঠানো এই দেশটি এখন সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিলের কবলে পড়েছে, ফলে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহগামী কর্মীরা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা ও সুপারিশ
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ এই পরিস্থিতিকে ‘বড় ধাক্কা’ (Major Shock) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, তারা বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন:
১. হুন্ডি প্রতিরোধ: অবৈধ পথে টাকা পাঠানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
২. সংকট কমিটি: ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন।
৩. শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প ও কম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমবাজার অনুসন্ধান।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ব্যবসায়িক স্থবিরতা আসবে, যার ফলে বেতন হ্রাস ও কর্মী ছাঁটাই হতে পারে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, যারা ৩-৪ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, তারা এখন আর্থিক ধ্বংসের মুখে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটে এক সভায় বলেন, “সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো প্রবাসীদের নিরাপত্তা। আমরা আহতদের চিকিৎসা ও লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছি। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আমরা বড় আকারের প্রত্যাবাসনের (Repatriation) কথা বিবেচনা করব।”
তৈরি পোশাক শিল্প এবং রেমিট্যান্স—এই দুই ফুসফুসের ওপর ভর করে টিকে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।