ঢাকা, ০২ সেপ্টেম্বর (বিডিইকোনমি) — দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের জন্য বিগত সরকারের ভুল জ্বালানি নীতি, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) যৌথভাবে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ: আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, বর্তমানে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। এই সংকটের বড় অংশই অতীতের ভুল নীতি ও সিদ্ধান্তের ফল। জনগণকে এই পার্থক্য বুঝতে দিলে তারা একটি জবাবদিহিতামূলক সরকারের কার্যকারিতা সঠিকভাবে বিচার করতে পারবেন।”
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দর ও সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বর্তমানে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১১ ডলার ব্যয় হচ্ছে। অথচ দেশে পর্যাপ্ত নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহের সক্ষমতা থাকলে অনেক কম খরচে জ্বালানি পাওয়া যেত।
তিনি আরও বলেন, অতীতে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা, দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন না করা এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, অতীতের জ্বালানি নীতির কারণে যে ‘কস্ট অব ইনঅ্যাকশন’ (সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ব্যয়) তৈরি হয়েছে, তার পাশাপাশি ‘কস্ট অব রং ডুইং’ (ভুল সিদ্ধান্তের ব্যয়), পাচার হওয়া অর্থ এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সৃষ্ট ঋণ ও দায়ের হিসাব নিরূপণ করা জরুরি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় ও থিংক ট্যাংকগুলোকে সমন্বিত গবেষণায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতা ও আমদানিনির্ভরতার ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটি অলিগার্কিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যা জনগণের অর্থ লুণ্ঠনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, ১৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ও ক্যালিওনারি কেয়ার ইউনিটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লুটপাট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে অতীতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের সামান্য বেশি থাকলেও তা ধীরে ধীরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং সেপ্টেম্বর মাস থেকেই এসব বন্ধ শিল্পে অর্থায়ন শুরু হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে গত অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি গণমাধ্যমকে বাস্তব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা দেন, অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম প্রান্তিকের বিস্তারিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও রাজস্ব অর্জনের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।