নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কয়েক দশকের লম্বা প্রতিশ্রুতি থাকলেও আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী ব্যালটে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ এবার ‘অ্যালার্মিং’ বা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পরিসংখ্যানের করুণ দশা
প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরও বেশি দল কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এর মধ্যে বড় দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী:
- প্রাথমিকভাবে ২,৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১০৯ জন (৪.২৪%)।
- বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত তালিকায় মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৬ জনে, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৩.৮৪ শতাংশ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারী মাত্র ৩.৩৮%, যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ১০%।
ভোটার অর্ধেক, প্রার্থী সামান্য
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবার দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪ লক্ষ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ২০০ জন। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেক ভোটার নারী হওয়া সত্ত্বেও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণের হার নগণ্য।
আইন ও বাস্তবতার ফারাক
২০২৫ সালের জুলাইয়ের ‘জাতীয় ঐকমত্য অধ্যাদেশ’-এর ধারা ২২ অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। ভবিষ্যতে এই হার ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশ এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় দলগুলো এটিকে মানছে না।
বিগত সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার:
- ২০০৮ (৯ম সংসদ): ৩.৫১% (৫৫ জন)
- ২০১৪ (১০ম সংসদ): ৫.৫৫% (৩০ জন)
- ২০১৮ (১১শ সংসদ): ০.৮১% (৭৩ জন)
- ২০২৪ (১২শ সংসদ): ৬.৬৭% (নির্বাচিত ২০ জন)
দলভিত্তিক নারী প্রার্থীর চিত্র
এবার সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের প্রাথমিকভাবে ১৫ জন নারী প্রার্থী থাকলেও যাচাই-বাছাই শেষে বর্তমানে ১১ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া:
- বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-মার্ক্সবাদী: ৯ জন
- জাসদ ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ: ৬ জন করে
- গণসংহতি আন্দোলন ও জাতীয় পার্টি: ৫ জন করে
- স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী: ৩৭ জনের মধ্যে টিকে আছেন মাত্র ৬ জন।
ক্ষোভ ও উদ্বেগ
নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ এবং ‘নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’ এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও এখনো দেশটিতে নারীদের অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর এই পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের অন্তরায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।