নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এবং রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার ফলে গত তিন বছর ধরে দারিদ্র্য বাড়ছে। আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধিতে মন্দাভাব ও সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ: বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্প রিজার্ভ, কঠোর আর্থিক নীতি এবং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর।
বাড়ছে দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ: প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে মাত্র কয়েক বছরে দেশে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।
২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।
নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি না বাড়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এ বছর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের নাজুক দশা: আর্থিক খাতের ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৬ শতাংশ। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে গেছে, যা ব্যাংকগুলোর ক্ষতি সামলানোর ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজস্ব ও বিনিয়োগে স্থবিরতা: ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অগ্রাধিকার খাতগুলোতে সরকারের বিনিয়োগের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যয় এবং ঋণের অভাবে ধুঁকছে।
বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ ও উত্তরণের পথ: বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেন, “বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূলে ছিল সাধারণ মানুষের সহনশীলতা। কিন্তু রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে আমূল সংস্কার ছাড়া এই সহনশীলতা বেশিদিন টিকবে না।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার শুরু হলে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে স্মার্ট ডি-রেগুলেশন, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬.৩ শতাংশে নামতে পারে। তবে অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী বলে মনে করে সংস্থাটি।