মঙ্গলবার ১৯ মে, ২০২৬
সর্বশেষ:
রাজধানীতে দেশের প্রথম ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সম্মেলন বুধবার<gwmw style="display:none;"></gwmw> অনলাইন সহিংসতা দেশে ৬৩.৫% নারী ডিজিটাল সহিংসতার শিকার: গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকার তাগিদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি ঋণের প্রবাহ বাড়াতে আগামী বাজেটে ব্যাংক ঋণ কমাচ্ছে সরকার ঈদুল আজহায় টানা ৭ দিন ব্যাংক বন্ধ, পোশাক শিল্প ও বন্দর এলাকায় সীমিত আকারে খোলা ঢাবিতে বিশ্ব আবহাওয়া দিবস পালিত: টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আহ্বান বিজিএমইএ সদস্যদের জন্য মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের বিশেষ ‘প্রিভিলেজ কার্ড’ চালু ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে, বিনিয়োগ কমাচ্ছে: অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ<gwmw style="display:none;"></gwmw><gwmw style="display:none;"></gwmw> ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসন ছাড়া অর্থনীতির সুদিন ফিরবে না: হোসেন জিল্লুর রহমান প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে এলসি জালিয়াতির অভিযোগ ২৬ পোশাক মালিকের: উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি

অনলাইন সহিংসতা দেশে ৬৩.৫% নারী ডিজিটাল সহিংসতার শিকার: গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিইকোনমি ঢাকা : দেশে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফ-জিবিভি) এবং অনলাইন হয়রানি এক ভয়াবহ সামাজিক ও মানবাধিকার সংকটে রূপ নিয়েছে। এক জাতীয় সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রায় ৬৩.৫১ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ধরণের অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

এই ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনি সুরক্ষার কঠোর প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বাড়াতে একটি জাতীয় পর্যায়ের মিডিয়া অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন বা প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স’ নিরসনে জাতীয় পর্যায়ের মিডিয়া অ্যাডভোকেসি শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থা ‘লাইট হাউস’ এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটিতে সরকারি কর্মকর্তা, জেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। প্রকল্পটি সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় ‘সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড’ (সিইএফ) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন, এমপি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহবুবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জকরিয়া এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শায়লা শার্মিন জামান।

বাড়ছে ঝুঁকি, আড়ালে থেকে যাচ্ছে ৮৫% অপরাধ সেমিনারে উপস্থাপিত ধারণা পত্রে (কনসেপ্ট পেপার) উল্লেখ করা হয়, ডিজিটাল প্রযুক্তি একদিকে যেমন নারীর শিক্ষা, অনলাইন উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে এর অপব্যবহার জেন্ডারভিত্তিক অপরাধের এক বিপজ্জনক মাত্রা তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে:

অনলাইন সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে ৮০.৩৫ শতাংশ নারীই অশালীন ও কুৎসিত যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন।

প্রায় ৫৩.২৮ শতাংশ নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন প্রস্তাব বা আপত্তিকর ছবি পাঠানো হয়েছে।

১৭.৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের ভুয়া ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক লোকলজ্জা, ভয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার অভাবের কারণে প্রায় ৮৫ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগই দায়ের করেন না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আইসিটি ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ভয়েস’ (VOICE)-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালেই ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ (পিসিএসডব্লিউ) ইউনিটে ৯,১১৭টি সাইবার হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে। ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ঘৃণা ছড়ানো, ডিপফেক (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিও), ডক্সিং (ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা) এবং প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৭৩ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাইবার হয়রানির শিকার হতেন, ২০২১ সালে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

ভার্চুয়াল জগতের ক্ষতি ছড়াচ্ছে বাস্তব জীবনেও আলোচকরা জানান, অনলাইন সহিংসতার প্রভাব কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা নারীর বাস্তব জীবনেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশ তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগেন। এছাড়া ৪২.৭৯ শতাংশ নারী লোকলজ্জার ভয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই অনলাইন সহিংসতা পরবর্তীতে অফলাইন বা বাস্তব জীবনের শারীরিক সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

বিশেষ করে সমাজ বা পেশাগতভাবে দৃশ্যমান নারী, যেমন—নারী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং নারী রাজনৈতিক কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে সংঘটিত ৬৪টি প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৭ জন উচ্চপর্যায়ের নারীকে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণকে স্তব্ধ করার একটি কৌশল। এর পাশাপাশি মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদের ওপর নজরদারি, ব্ল্যাকমেইল এবং অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয় সেমিনারে সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে একের পর এক ডিজিটাল আইন পাস করা হলেও তা নাগরিক-বান্ধব সুরক্ষার চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। ফলে লাখ লাখ গ্রামীণ নারী ও কিশোরী প্রাইভেসি সেটিংস বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো মৌলিক নিরাপত্তা না জেনেই স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন, যা তাদের সাইবার-চাঁদাবাজদের সহজTarget-এ পরিণত করছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শার্মিন জামান সাইবার অপরাধের অভিযোগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ভুক্তভোগীবান্ধব করার জন্য নীতিগত সমন্বয়ের ওপর জোর দেন, যাতে অভিযোগ করতে গিয়ে নারীরা পুনরায় মানসিক ট্রমার শিকার না হন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে সাইবার অপরাধের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জেন্ডার-সংবেদনশীল নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা এবং মর্যাদা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে।

সেমিনারের শেষভাগে একটি নিরাপদ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ (সিএসও), গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশলগত কাঠামো তৈরির আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আধুনিকায়ন এবং নারী ও যুবকদের মধ্যে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ৪০ জন সিনিয়র সাংবাদিকসহ মোট ৯০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।