ড্যাভোস, সুইজারল্যান্ড : রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক দূরত্বের প্রেক্ষাপটে নিজেদের স্বাধীনভাবে সশস্ত্র করতে এক ঐতিহাসিক দৌড়ে নেমেছে ইউরোপ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ড্যাভোস) এক আলোচনায় উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব শক্তিশালী প্রতিরক্ষা স্তম্ভ গড়ে তুলতে ইউরোপের প্রয়োজন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলার।
কেন এই তোড়জোড়?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সৃষ্ট টানাপড়েন ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন সহায়তা ও সফটওয়্যার আপডেট ছাড়া তাদের যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমানগুলো ওড়া সম্ভব নয়। এই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতেই ইউরোপ এখন নিজস্ব অস্ত্র তৈরির গতি বাড়িয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা ও অর্জন
গত এক দশকে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে ৫৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই খাতের পরিবর্তনের প্রধান চিত্রগুলো হলো:
- নতুন কারখানার জোয়ার: জার্মানির রেইনমেটাল (Rheinmetall) ২০২২ সালের পর থেকে ১৬টি নতুন কারখানা নির্মাণ করছে।
- কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: ইতালীয় প্রতিরক্ষা জায়ান্ট লিওনার্দো (Leonardo) মাত্র দুই বছরে তাদের কর্মী সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪ হাজারে উন্নীত করেছে।
- স্টার্টআপের উত্থান: মিউনিখভিত্তিক ড্রোন কোম্পানি ‘টুয়েন্টিফোর ইন্ডাস্ট্রিজ’ মাত্র এক বছরে শত শত ড্রোন বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে, যা পাঁচ বছর আগেও অসম্ভব ছিল।
সক্ষমতার ঘাটতি ও নির্ভরতা
প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ইউরোপ অনেক এগিয়ে গেলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল।
| ইউরোপের শক্তি (যা তারা নিজেরাই বানায়) | ইউরোপের দুর্বলতা (যেখানে মার্কিন নির্ভরতা আছে) |
| নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন | স্টিলথ ফাইটার জেট (F-35) |
| কামানের গোলা ও হাউইটজার | দূরপাল্লার মিসাইল ও রকেট আর্টিলারি |
| ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান | স্যাটেলাইট ইন্টেলিজেন্স |
| ড্রোন ও ছোট আগ্নেয়াস্ত্র | দূরপাল্লার ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা |
মার্কিন অর্থনীতির ওপর প্রভাব
ইউরোপ যদি ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, তবে এই অঞ্চলে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের বাজার সংকুচিত হবে। বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ আসে ইউরোপীয় বাজার থেকে। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজস্ব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকলে মার্কিন প্রতিরক্ষা খাত বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
পরিশেষে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (IISS) মনে করছে, বর্তমান মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা ইউরোপের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল চ্যালেঞ্জ।