বিশেষ প্রতিবেদক | দাভোস, সুইজারল্যান্ড: দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতি যে নিয়মে চলে আসছিল, সেই ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগ এখন অতীত। নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এখন বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সম্মেলনে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিং-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পল গ্রুয়েনওয়াল্ড।
‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ থেকে বিচ্যুতি
গ্রুয়েনওয়াল্ড জানান, আগে মনে করা হতো মুক্তবাজার, অবাধ বাণিজ্য এবং পুঁজির অবাধ প্রবাহই অর্থনীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে দেশগুলো বাণিজ্যের চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, “পুরানো ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল একমাত্র ‘পরহিতৈষী আধিপত্যকারী’ (Benevolent Hegemon), কিন্তু এখন সেই ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থার বদলে বিভিন্ন জোট ও স্বার্থের এক জটিল মিশেল বা ‘প্যাচওয়ার্ক’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিযোগিতা ও নতুন মেরুকরণ
বিশ্ব অর্থনীতি এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গ্রুয়েনওয়াল্ডের মতে, নতুন এই বিশ্বব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট ছকে চলবে না। বাণিজ্য, নিরাপত্তা বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন জোট বা কম্বিনেশনে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর (Middle Powers) ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বহুমুখী জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা
পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে শুধু অর্থনীতিবিদ হওয়া আর যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন গ্রুয়েনওয়াল্ড। তিনি বলেন, “এখন আমাদের বহুমুখী জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। বর্তমান বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতি বুঝলে চলবে না; ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি খাত এবং ঋণ বাজারের জটিলতাগুলোকেও একত্রে সমন্বয় করতে হবে।”
২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের মতে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.২ শতাংশ। বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিলে এই হারকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একেকটি প্রধান অর্থনীতির চিত্র একেক রকম:
- যুক্তরাষ্ট্র: ট্যারিফ বা শুল্ক যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
- ইউরোপ: নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) অর্জনে মনোযোগী।
- চিন: আবাসন খাতের সংকট এবং মুদ্রাসংকোচন (Deflation) মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
এআই (AI) এবং বাজারের ঝুঁকি
ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে বিশাল বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখলেও, গ্রুয়েনওয়াল্ড সতর্ক করেছেন শেয়ার বাজারের উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে। বাজারে অতিরিক্ত আশাবাদ থাকলেও এআই শেয়ারের এই উল্লম্ফন ‘বাবল’ বা ফানুস কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সবাই এই পরিবর্তন থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হতে পারবে না; এখানে স্পষ্টভাবে কিছু পক্ষ জয়ী হবে এবং কিছু পক্ষ হারাবে।”