আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ইস্তাম্বুল: ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার এক বছর পূর্ণ হলো। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ট্রাম্প আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘তীক্ষ্ণ’ এবং ‘অসংযত’। ২০১৭ সালের প্রথম মেয়াদে রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্ট বা প্রথাগত রাজনীতিকরা তাঁর ওপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন, এবার তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে এক বছরের মধ্যেই মার্কিন শাসনব্যবস্থা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত এক বছরে ট্রাম্প মোট ২২৮টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যা তাঁর প্রথম মেয়াদের পুরো চার বছরের (২২০টি) সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল বাগাড়ম্বর নয়, বরং দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের একটি প্রতিফলন।
বিদেশনীতি: ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’র পুনরুত্থান
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, যাকে বিশ্লেষকরা ১৯শ শতাব্দীর ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ এবং ‘মনরো ডকট্রিন’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
- আঞ্চলিক আধিপত্য: ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করার সামরিক অভিযান এবং পানামা খালের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি—সবই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
- ন্যাটো ও ইউরোপ: ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এখন অনেক বেশি ‘লেনদেনমূলক’। ২০২৫ সালের জুন মাসে হেগ সম্মেলনে স্পেনের বাইরে বাকি মিত্র দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রথম মেয়াদে ন্যাটো ত্যাগের হুমকি দিলেও এবার ট্রাম্প জোটকে নিজের শর্তে ব্যবহার করছেন।
অভ্যন্তরীণ নীতি: অভিবাসীদের ওপর কঠোর খড়্গ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিবাসন। প্রথম মেয়াদে তাঁর নীতিগুলো আইনি জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হলেও এবার তা অনেক বেশি পরিকল্পিত ও শক্তিশালী।
- সর্বাত্মক অভিযান: প্রশাসন অভিবাসনকে একটি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি ক্ষমতা ও সামরিক সম্পদ ব্যবহার করছে। অভিবাসন নীতি সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ ইতিমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে।
- প্রযুক্তি ও নজরদারি: আইআরএস (IRS) ও সামাজিক নিরাপত্তা দপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে অভিবাসীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। আইস (ICE) এজেন্টরা ফেশিয়াল রিকগনিশন, আইরিশ স্ক্যানার ও লাইসেন্স প্লেট রিডার ব্যবহার করছেন, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: নির্বিচারে অভিবাসী বিতাড়নের ফলে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে শ্রমসংকট দেখা দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘রিয়েল’ ট্রাম্পের প্রকাশ
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান বলেন, “আমরা এখন প্রকৃত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখছি, যার ওপর প্রথাগত রিপাবলিকানদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।” তাঁর মতে, ট্রাম্পের এই দ্বিতীয় মেয়াদ নব্য-বিচ্ছিন্নতাবাদ (Neo-isolationism) এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদের (Neo-imperialism) এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ডিইআই (DEI) কর্মসূচি বাতিল এবং জেন্ডার প্রটেকশন বা লিঙ্গ সুরক্ষা নীতিগুলো থেকে সরে এসে ট্রাম্প একটি কঠোর রক্ষণশীল সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন।
সংবাদের মূল বিষয়গুলো:
- রেকর্ড নির্বাহী আদেশ: এক বছরেই প্রথম মেয়াদের ৪ বছরের চেয়ে বেশি আদেশ জারি।
- বিদেশনীতি: লাতিন আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের ওপর বিশেষ নজর এবং ন্যাটোর ওপর চাপ।
- অভিবাসন: সব পর্যায়ের অনথিভুক্ত অভিবাসীদের লক্ষ্য করে সামরিক ও প্রযুক্তিগত অভিযান।
- আইন ও নিয়ন্ত্রণ: প্রথাগত রিপাবলিকানদের অপসারণের ফলে ট্রাম্প এখন অপ্রতিরোধ্য।