নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা : বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং পুঁজিবাজার বর্তমানে ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে’ (Over-regulation) শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত (De-regulation) এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে পরিচালিত করা অপরিহার্য।1
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বনানীর একটি হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী ২০২৬-এর দিগন্ত: অর্থনীতি, রাজনীতি ও পুঁজিবাজার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।2
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আমির খসরু বলেন, দীর্ঘ ১৬-১৮ বছর পর দেশের নাগরিকরা ভোট দিয়ে একটি দায়বদ্ধ সরকার গঠনের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “একটি স্বচ্ছ নির্বাচন এবং স্থিতিশীল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিশ্বখ্যাত ফান্ড ম্যানেজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা।3 দেশে আস্থার পরিবেশ ফিরলে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে।4”
পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা
আমির খসরু বলেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার অকার্যকর হয়ে আছে।5 এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, “ব্যাংক থেকে যথেচ্ছ ঋণ নেওয়া হয়েছে এবং এর বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা আমাদের আর্থিক খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।”
দেশের পুঁজিবাজারের করুণ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক তথ্য প্রদান করেন:
| বিষয় | বাংলাদেশ | ভারত | পাকিস্তান |
| জিডিপি-র তুলনায় বাজার মূলধনের অনুপাত | ১০% এর নিচে | প্রায় ৬০% | প্রায় ৪০% |
খেলাপি ঋণ ও স্বচ্ছতার অভাব
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ (NPL) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারি হিসেবে খেলাপি ঋণ ৩৬ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। “যদি অ্যাকাউন্টিংয়ের কারসাজি বা ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বন্ধ করা হয়, তবে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। লোকসান হলে সেটি লোকসান হিসেবেই দেখাতে হবে,” বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: উদারীকরণই মূল চাবিকাঠি
নির্বাচনে বিজয়ী হলে প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে মানসম্পন্ন বেসরকারি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে অগ্রাধিকার দেবে। এছাড়া বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেলওয়ে বা মিউনিসিপালিটির মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘মিউনিসিপাল বন্ড’ বা ‘সভেরেন বন্ড’ ছাড়ার পরামর্শ দেন তিনি।6
আমির খসরু পরিশেষে বলেন, “আমরা বাজারকে বাজারের নিয়মে চলতে দিতে চাই। বিধি-নিষেধ উদারীকরণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।”
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ও র্যাপিড-এর চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। এছাড়া বিএসইসি কমিশনার এম সাইফউদ্দিন, সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন।
সংবাদের মূল দিকগুলো:
- প্রধান দাবি: অর্থনীতিকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে উদারীকরণ করতে হবে।7
- নির্বাচনী প্রেক্ষাপট: ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা নির্ভর করছে।8
- আর্থিক সংকট: খেলাপি ঋণের প্রকৃত হার ৪০ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে শঙ্কা।
- প্রস্তাব: আইএমএফ-এর কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের বদলে বন্ড ইস্যু করে তহবিল সংগ্রহ।9