আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ব্রাসেলস: ইউরোপীয় কৃষক ও কৃষি সংগঠনগুলোর ব্যাপক বিরোধিতা ও বিক্ষোভ সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যিক ব্লক ‘মারকোসুর’-এর (Mercosur) সঙ্গে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হতে যাচ্ছে, যা প্রায় ৭০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে।
চুক্তির মূল দিকসমূহ
এই চুক্তির আওতায় ইইউ এবং মারকোসুর (ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে) তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- ইউরোপের লাভ: এই চুক্তির ফলে ইউরোপ থেকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি এবং ওয়াইন রপ্তানি সহজ হবে।
- মারকোসুরের লাভ: দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে মাংস, চিনি, মধু এবং সয়াবিন ইউরোপের বাজারে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এই চুক্তিকে “দুই মহাদেশকে সংযুক্ত করার মুহূর্ত” হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা একে “বহুপাক্ষিকতাবাদের বিজয়” বলে বর্ণনা করেছেন।
কৃষকদের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও ইউরোপের ভেতরে, বিশেষ করে ফ্রান্সে কৃষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা সস্তা কৃষি পণ্য ইউরোপের বাজারের দখল নেবে, যার ফলে স্থানীয় কৃষকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
- প্যারিসে ট্রাক্টর মিছিল: প্যারিসের রাস্তায় প্রায় ৩৫০টি ট্রাক্টর নিয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।
- পোল্যান্ডেও প্রতিবাদ: পোলিশ কৃষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সস্তা পণ্য তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
ফরাসি কৃষকদের শান্ত করতে সরকার ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তা বিক্ষোভ থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সামনে আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও এটি কার্যকর করতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। আগামী বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাবের ওপর ভোট হতে পারে, যা চুক্তিটিকে ইউরোপীয় বিচার আদালতে পাঠানোর সুপারিশ করতে পারে। এমনটি হলে চুক্তিটি বাস্তবায়নে আরও ১৮ মাস দেরি হতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী মে মাসের মধ্যে চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে।
কেন চিন্তিত ইউরোপীয় কৃষকরা?
২০২৫ সালে ব্রাজিলের খাদ্যশস্য উৎপাদন রেকর্ড ৩৪৬.১ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৮.২ শতাংশ বেশি। দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা এবং কম উৎপাদন খরচের কারণে তাদের পণ্যের দাম ইউরোপের তুলনায় অনেক কম। কোপা-কোগেকা (Copa-Cogeca) নামক ইইউ-র প্রধান কৃষি সংগঠন এই চুক্তিকে “অসম ও ত্রুটিপূর্ণ” বলে আখ্যা দিয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক ও সংরক্ষণবাদের মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। মারকোসুরের সাথে এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি বড় কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে চীন মারকোসুরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।