নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের সঞ্চয়পত্র খাতে এক নীরব সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে আগের জমানো টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা (নগদায়ন) বেড়েছে। ফলে টানা তৃতীয় অর্থবছরের মতো এই খাতে নিট বিনিয়োগ নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা ঋণাত্মক (নেগেটিভ) হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে বড় পতন
বিশেষ করে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এই পতন ছিল অত্যন্ত তীব্র। তথ্যমতে:
- ফেব্রুয়ারি মাস: এ মাসে মোট ৬,৪০৬ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও গ্রাহকরা মূল ও মুনাফাসহ তুলে নিয়েছেন ৭,৫৭১ কোটি টাকা। ফলে নিট বিনিয়োগ ১,১৬৫ কোটি টাকা ঋণাত্মক হয়েছে।
- জানুয়ারি মাস: এ মাসে ঘাটতি ছিল আরও বেশি। ৭,১৬১ কোটি টাকার বিক্রির বিপরীতে গ্রাহকরা উত্তোলন করেছেন ৯,০১২ কোটি টাকা, যা ১,৮৫১ কোটি টাকার নিট ঘাটতি তৈরি করেছে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতিই এই নেতিবাচক ধারার প্রধান কারণ। নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আগের সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে।
এছাড়া, অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সর্বোচ্চ ১১.৯৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখায় এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি সেদিকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বাজেট অর্থায়নে চাপ
সঞ্চয়পত্র খাতে এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। সাধারণত সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগকে সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে ঘাটতি থাকায় সরকারকে এখন ব্যাংক ঋণের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১.০৪ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও, অর্থবছরের কয়েক মাস বাকি থাকতেই ব্যাংক ঋণ ১.০৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সঞ্চয়পত্র খাতের এই ধস নতুন নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও এ খাত থেকে ১৫,৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও নিট বিনিয়োগ প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ, যখন নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ২১,১২৪ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সঞ্চয় খাতে এই দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ধারা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ভিত্তি ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।