নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি: পাহাড়বেষ্টিত জেলা রাঙামাটির পরিবেশ রক্ষা, টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নদীভাঙন রোধে বড় ধরনের এক উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় কর্ণফুলী ও সংশ্লিষ্ট নদীসমূহের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮৭.৩৯ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে। প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। রাঙামাটির ১০টি উপজেলা এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মূল লক্ষ্য ও নদী খনন (ড্রেজিং)
রাঙামাটির মানুষ পানীয় জল, সেচ, মৎস্য চাষ এবং যাতায়াতের জন্য প্রধানত নদ-নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এখানে তীব্র পানিসঙ্কট দেখা দেয়। প্রকল্পের অধীনে প্রধান নদীগুলো— কর্ণফুলী, কাসালং, রাইক্ষ্যং এবং শলক— খনন করে পলি অপসারণ করা হবে। এর ফলে:
- কাপ্তাই হ্রদে সারা বছর পানির প্রবাহ বজায় থাকবে।
- বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা প্রতিরোধ করা যাবে।
- দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
- শুষ্ক মৌসুমে নৌ-চলাচল সহজ হবে এবং কৃষিকাজে সেচ সুবিধা বাড়বে।
নদীভাঙন রোধ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা
প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী ও তার শাখা নদীগুলোর প্রায় ১৩.৭২ কিলোমিটার এলাকায় নদীভাঙন রোধে কাজ করা হবে। বিশেষ করে:
- সীমান্ত এলাকা: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী থেগামুখ এলাকায় শক্তিশালী ভাঙন রোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেখানে বিজিবি (BGB) ক্যাম্প, স্থানীয় বাজার ও স্কুলসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা হবে।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা: বরকল উপজেলার সাথে জেলা সদরের একমাত্র নদীপথ সচল রাখতে নদী তীর সংরক্ষণ কাজ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে।
খাল খনন ও কৃষি উন্নয়ন
দীঘদিন পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া সংযোগ খালগুলো পুনঃখনন করা হবে। এতে জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং কৃষি জমিতে পানির প্রাপ্যতা বাড়বে। ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিং (IWM)-এর এক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও গুরুত্ব
১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর থেকে কর্ণফুলী নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে পরিবর্তন আসে। প্রতি বছর পলি জমে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে নৌ-চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা দুর্গম এলাকার মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে:
১. পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বাড়বে।
২. মৎস্য সম্পদ ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে।
৩. কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এই প্রকল্পটিকে রাঙামাটির পরিবেশ ও মানুষের জন্য একটি কৌশলগত ও টেকসই বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।