আন্তর্জাতিক ডেস্ক :প্রথম দেখায় প্রশ্নটি অবান্তর মনে হতে পারে—মাত্র কয়েক হাজার মানুষের বসবাস আর বরফে ঢাকা এক নির্জন দ্বীপ কেন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হবে? কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ড এখন আর কোনো প্রান্তিক অঞ্চল নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির এক কৌশলগত মেরু। ২০২৬ সালে এসে হোয়াইট হাউস যখন এই দ্বীপটিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য’ বলে ঘোষণা করেছে, তখন এর নেপথ্যে কাজ করছে প্রধানত তিনটি কারণ: জলবায়ু পরিবর্তন, খনিজ সম্পদ এবং আকাশপথের নিরাপত্তা।
১. উত্তর মেরুর নতুন ‘গ্লোবাল হাইওয়ে’
কয়েক শতাব্দী ধরে প্রতিকূল জলবায়ুর কারণে আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল নিয়ে কারো খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বরফ গলে যাওয়ার ফলে এই দুর্গম অঞ্চল এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
- সংক্ষিপ্ত নৌপথ: আর্কটিক মহাসাগরে নতুন নৌপথ (যেমন: নর্দান সি রুট) তৈরির ফলে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যে যাতায়াতের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
- কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ: গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক এবং আর্কটিক মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। যারা এই দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ভবিষ্যতের এই ‘গ্লোবাল হাইওয়ে’ বা বৈশ্বিক মহাসড়কের নিয়মকানুন ও নিরাপত্তা তদারকি করার ক্ষমতা রাখবে।
২. পিটুফিক স্পেস বেস এবং আকাশ নিরাপত্তা
গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস (সাবেক থুলে এয়ার বেস) যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কবার্তা প্রদান এবং মহাকাশ নজরদারি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

- ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা: বর্তমান সময়ে হাইপারসনিক অস্ত্রের যুগে প্রতিক্রিয়ার সময় খুব কম থাকে। উত্তর মেরু হয়ে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাতে অন্য যেকোনো পথের চেয়ে কম সময় নেয়।
- ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি: ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকলে তারা শত্রুপক্ষের যেকোনো হামলা অনেক আগে শনাক্ত করতে পারবে এবং দ্রুত পালটা ব্যবস্থা নিতে পারবে।
৩. খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার
বরফ গলার ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিচে থাকা বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান সহজ হচ্ছে।
- তেল ও গ্যাস: ধারণা করা হয়, এখানে বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে।
- রেয়ার আর্থ মেটাল: স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ সম্পদের (Rare Earth Elements) অন্যতম বড় উৎস এই গ্রিনল্যান্ড।1 বর্তমানে এই বাজারের বড় অংশ চীনের দখলে, যা থেকে মুক্তি পেতে চায় ওয়াশিংটন।
ডেনমার্ক ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহ ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।2 ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। এমনকি কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ন্যাটো (NATO) জোটের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন তার অবস্থানে অনড়। ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ প্রতিনিধিদের মতে, “গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল ভূখণ্ডের বিষয় নয়, এটি ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য ধরে রাখার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।”