নিজস্ব প্রতিবেদক, এপ্রিল ২৪, ঢাকা: রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং প্রকল্প ব্যয়ের চাপ সামলাতে ব্যাংক ব্যবস্থার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিচ্ছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে ‘হাই পাওয়ার মানি’ বা নতুন টাকা বাজারে ছাড়ার ফলে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাস ১০ দিনেই (৯ এপ্রিল পর্যন্ত) সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আড়াই মাস বাকি থাকতেই লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। এর মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনে বর্তমান সরকার নিয়েছে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের প্রয়োজনীয়তা চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আয়ের এই নাজুক পরিস্থিতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের বিল পরিশোধে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
টাকা ছাপানোর প্রভাব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট থাকায় সরকার সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিচ্ছে। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্যানুয়ায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন টাকা তৈরি করে সরকারকে ধার দেয়, তখন তা বাজারে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করে। এক টাকা ছাপানো হলে বাজারে সেটি পাঁচ টাকা পর্যন্ত নগদ প্রবাহ তৈরি করতে পারে। পণ্য উৎপাদন না বেড়ে এভাবে টাকা সরবরাহ বাড়লে হু হু করে দ্রব্যমূল্য বাড়ে এবং টাকার মান কমে যায়।
বেসরকারি খাতে প্রভাব সরকার ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি টাকা নিলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় মূলধন পাচ্ছেন না, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানো অনেকটা দুধে পানি মেশানোর মতো; এতে পরিমাণ বাড়লেও পুষ্টিগুণ বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সরকারকে সরাসরি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলেও টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলছে।
এখনই কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট আরও চরমে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।