কেবল কিছু টাকা হাতে তুলে দেওয়া নয়, বরং একটি পরিবারকে অভাবের দিনে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া—এমনই এক মানবিক দর্শন নিয়ে সাজানো হচ্ছে বাংলাদেশের আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এবার প্রচলিত ‘ভাতা’র ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুসংগঠিত ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ গড়ার সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করবেন, তখন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা।
এক কার্ডে পুরো পরিবারের নিরাপত্তা এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এটি কেবল একটি প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক নিশ্চয়তাপত্র। আগামী বছর ৪১ লাখ পরিবার এই কার্ডের আওতায় আসবে, যারা প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা পাবে। লক্ষ্যটা আরও সুদূরপ্রসারী—২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারের কাছে এই সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া। সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার: একই ব্যক্তি যেন বারবার সুবিধা না পায়, বরং প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলো যেন রাষ্ট্রের ছায়াতলে আসে।
কৃষক ও বয়স্কদের মুখে হাসি মাঠে ঘাম ঝরানো ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের জন্য আসছে ‘কৃষক কার্ড’। বছরে ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তার পাশাপাশি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সার, বীজ বা ঋণ পেতে তাদের আর দালালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়।
অন্যদিকে, বয়স্ক ও বিধবা মায়েদের জন্য ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এখন থেকে তারা মাসে ৭০০ টাকা করে পাবেন। তবে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ওপর, যাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাসিক ১,০০০ টাকা। এছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা বাড়িয়ে ৩৬ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আর্তমানবতার সেবায় বিশেষ উদ্যোগ ক্যানসার, থ্যালাসেমিয়া বা লিভার সিরোসিসের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্তদের জন্য সরকার এবার সহায়তার হাত দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেখানে আগে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হতো, এখন থেকে ৬৫ হাজার রোগী পাবেন ১ লাখ টাকা করে। সংকটের এই সময়ে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন আরও ৬০ লাখ পরিবার।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও কর্মসংস্থান এই প্রথম এত বড় আকারে মসজিদ, মন্দির ও গির্জার কর্মীদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করছে সরকার। ২ লাখ ৫৬ হাজার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য ১,০৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা তাদের সামাজিক মর্যাদাকে আরও সুসংহত করবে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরিতে দেশজুড়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ যখন বৈশ্বিক সংকট ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যখন সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তুলছে, তখন এই বিশাল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই মানবিক উদ্যোগগুলো সফল করতে হলে রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ জয় করতে হবে এবং প্রকৃত দরিদ্রদের খুঁজে বের করতে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি হয়ে উঠতে পারে কোটি মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও নতুন এক ভরসার দলিল।