নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : নতুন সরকার গঠনের ঠিক একদিন আগে তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। কর্মকর্তাদের এই প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি থমকে গেছে।
সোমবার সকালে কর্মকর্তারা পর্ষদ সভা স্থগিতের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলন করেন। এর ফলে দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হলেও তাতে কোনো ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়নি। সভা শেষে জানানো হয়, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন প্রতিবেদন বা কে কত নম্বর পেয়েছে, তা কেবল পর্ষদকে অবহিত করা হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ
সকালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা অভিযোগ করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যখন নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মাত্র একদিনের নোটিশে এই জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। তারা একে ‘অনৈতিক’ ও ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন।
কাউন্সিলের দাবি, বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর অতীতে যে বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, সেই একই গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতেই এই ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের তোড়জোড় চলছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ছাড়া বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই বহিরাগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগও তোলেন তারা।
আইনি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’ অনুযায়ী একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হতে পারে না। তা ছাড়া ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এ ধরনের বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া আইন ও প্রথা—উভয়েরই লঙ্ঘন।
দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক থাকলেও খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ (সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) ছাড়িয়ে গেছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবাদের মুখে বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এক অফিস আদেশে জানায়, ব্যাংক সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মচারী জনসমক্ষে বা সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য দিতে পারবেন না।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, পর্ষদের জরুরি সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য ১৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি
- ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান
- আমার ডিজিটাল ব্যাংক
- ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি
- বুস্ট (রবি আজিয়াটা)
- নোভা ডিজিটাল ব্যাংক (বাংলালিংক ও স্কয়ার)
- মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি (আশা)
- জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক (ডিবিএল গ্রুপ)
- মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক (আকিজ রিসোর্স)
- বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক
- উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক
অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল এই বিতর্কিত প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ এবং স্বার্থের সংঘাত ও স্বজনপ্রীতির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।