নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: প্রযুক্তির উৎকর্ষে বদলে যাচ্ছে বাঙালির চিরাচরিত ‘ঈদ সালামি’র ধরন। ডিজিটাল লেনদেন এবং সৃজনশীল অনলাইন গিফট ট্রেন্ডের ভিড়ে নগদ টাকার পাশাপাশি এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ডিজিটাল সালামি’। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেছে নিচ্ছেন।
ঈদুল ফিতরের চিরচেনা ছবি ছিল বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে ছোটদের নতুন কড়কড়ে নোট গ্রহণ। তবে বর্তমান সময়ে এই ঐতিহ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে মোবাইল ব্যাংকিং এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব।
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার
বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো সহজলভ্য হওয়ায় সালামি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর কোনো বাধা নয়। অনেক তরুণ এখন মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে মজার ছলে বড়দের কাছে সালামি চাইছেন, আর বড়রাও মুহূর্তের মধ্যেই ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারির সময় থেকে এই প্রবণতা শুরু হলেও এখন এটি একটি সুবিধাজনক ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নাফিস আলমের মতে, নতুন টাকার সেই পুরোনো ঘ্রাণ কিছুটা মিস করলেও দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়দের কাছ থেকে দ্রুত সালামি পাওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমটি অত্যন্ত কার্যকর।
নতুন নোটের সংকট ও ক্যাশলেস অর্থনীতি
ডিজিটাল সালামি বাড়ার পেছনে বাজারে নতুন নোটের সংকটও একটি বড় কারণ। ছাপানোর খরচ কমাতে—যা বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা—কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার নতুন নোট বাজারে ছাড়েনি। মূলত ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’ বা নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে খোলা বাজারে নতুন টাকার বান্ডিল কিনতে গিয়ে বাড়তি প্রিমিয়াম বা টাকা গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
নতুন ট্রেন্ড: ‘সালামি তোড়া’
সালামি দেওয়ার পদ্ধতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন এক নান্দনিক মাত্রা— ‘সালামি তোড়া’। সরাসরি হাতে টাকা গুঁজে দেওয়ার বদলে এখন অনেকে নগদ নোট দিয়ে সাজানো ফুলের তোড়া উপহার দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ট্রেন্ডটি ভাইরাল হওয়ায় অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য এক নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।
‘আরা’স ফ্লেয়ার’-এর উদ্যোক্তা ইসমত আরা জানান, ঈদ উপলক্ষে এই ধরনের কাস্টমাইজড মানি বুকেট বা টাকার তোড়ার চাহিদা আকাশচুম্বী। নকশা এবং নোটের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই তোড়া তৈরির খরচ ৩০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
নগদ টাকা থেকে ডিজিটাল ওয়ালেট কিংবা বাহারি তোড়া—সালামি দেওয়ার মাধ্যম বদলালেও এর মূল চেতনা অপরিবর্তিত রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, প্রযুক্তির প্রভাবে সালামির ‘রূপ’ বদলেছে ঠিকই, তবে বড়দের স্নেহ আর ছোটদের আনন্দের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার যে মূল উদ্দেশ্য, তা আজও অটুট।