নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডে সামরিক হামলার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১২ ডলারে ঠেকেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ নিরাপদ রাখতে সরকারকে অবিলম্বে ‘জরুরি ও আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি মূল্যের এই তীব্র উল্লম্ফন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সতর্কতা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখন আর ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করার অবস্থায় নেই।
তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখন আর আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি বিশ্ব জ্বালানি করিডোরের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার তেলের দাম ১১২ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ হবে প্রবল। শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে হঠাৎ ভেঙে না পড়ে, সেজন্য আমাদের এখনই সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের উচিত দ্রুত জ্বালানি আমদানির কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করা। বিশেষ করে দক্ষিণ পার্স ফিল্ডে হামলার পর স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে এলএনজি ও জ্বালানি তেল কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাজারের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৮ শতাংশের বেশি বেড়ে ১১২.৪০ ডলারে স্থির হয়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ পার্স অবকাঠামোতে হামলার খবরের পরপরই এই অস্থিরতা শুরু হয়, যা ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ঢাকার বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে প্রতি ডলার তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে কোটি কোটি ডলার যুক্ত হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, “তেলের দাম ১১২ ডলার হওয়া মানে আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা লেনদেনের ভারসাম্যে বড় চাপ সৃষ্টি হওয়া। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা পুরো অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির নতুন ঢেউ তৈরি করবে।”
বিশেষজ্ঞদের তিন দফা সুপারিশ এই অস্থিরতা মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদরা একটি ত্রি-মুখী কৌশলের পরামর্শ দিয়েছেন: ১. দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি: স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এলএনজি ও জ্বালানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল চুক্তিতে ফেরা। ২. মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি: আপৎকালীন সংকট বা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ৩. জ্বালানি সাশ্রয়: উচ্চমূল্যের আমদানির ওপর চাপ কমাতে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলো আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যদি দক্ষিণ পার্সে হামলার মতো ঘটনা অব্যাহত থাকে, তবে এলএনজি সরবরাহ চেইন দীর্ঘমেয়াদী বিলম্বের মুখে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড এবং তৈরি পোশাক শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদন খাতের ওপর।