আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে চালানো হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যা আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ধরণ আমূল বদলে দিচ্ছে।
ক্লদ এবং প্যালান্টিয়ারের ভূমিকা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই হামলায় অ্যানথ্রোপিক-এর এআই মডেল ‘ক্লদ’ (Claude) ব্যবহার করেছে। এটি মূলত ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ থেকে হামলা পর্যন্ত সময়কে সংকুচিত করতে সাহায্য করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর যুদ্ধপরিকল্পনা দ্রুততর করার জন্য তাদের মডেল উন্মুক্ত করে। এটি মূলত ‘প্যালান্টিয়ার’ নামক একটি যুদ্ধ-প্রযুক্তি কোম্পানির মাধ্যমে পেন্টাগনের সিস্টেমে যুক্ত করা হয়, যা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মকর্তাদের সহায়তা করে।
ইসরায়েলের ‘ল্যাভেন্ডার’ সিস্টেম অন্যদিকে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা ও পরবর্তী সংঘাতগুলোতে নজিরবিহীন স্কেলে এআই ব্যবহার করছে। আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘দ্য নিউজ রিপাবলিক’-এর তথ্যমতে, ইসরায়েল ‘ল্যাভেন্ডার’ (Lavender) নামক একটি এআই-চালিত ডাটাবেস ব্যবহার করেছে। গত এপ্রিলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই সিস্টেমটি হামাসের সাথে জড়িত সন্দেহে প্রায় ৩৭ হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও মানবিক ঝুঁকি যুদ্ধক্ষেত্রে এআই-এর এই জয়জয়কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বেইজিং ইউনিভার্সিটি অফ পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনের হিউম্যান-মেশিন ইন্টারঅ্যাকশন ল্যাবরেটরির পরিচালক লিউ ওয়েই গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, “এআই তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে দক্ষ হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই মানুষের হাতে থাকতে হবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই-এর নিজস্ব নৈতিক বিচারবুদ্ধি নেই। এটি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতারণা বা সাধারণ মানুষের সংবেদনশীলতা বুঝতে অক্ষম। মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন এআই শেষ পর্যন্ত একটি ‘ভোঁতা অস্ত্রে’ পরিণত হতে পারে, যা মানবতার অপূরণীয় ক্ষতি করবে।
ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধরন চীনের আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ শিয়াং লিগাং মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধের কৌশলগত পরিবর্তন ঘটছে। তিনি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের সাতটি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন: সিস্টেমাইজেশন, মডুলারাইজেশন, ইন্টেলিজেন্টাইজেশন, মিনিয়েচারাইজেশন, প্রিসিশন (নির্ভুলতা), চালকহীন অপারেশন এবং স্বল্প খরচ।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন ধরনের অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এআই-এর এই প্রয়োগ শুধু যুদ্ধকৌশল নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থা এবং মানব সভ্যতার গতিপথকেও বদলে দিতে পারে।